এনামুল হক রাশেদী,চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েকদিন ধরেই জোর আলোচনা ছিল—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিতে পারেন। দলটির চট্টগ্রাম মহানগরের আয়োজিত বৃহৎ যোগদান অনুষ্ঠানকে ঘিরে সেই আলোচনা আরও তীব্র হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বহুল আলোচিত সেই ‘চমক’ আর দেখাতে পারেনি এনসিপি। বৃহস্পতিবার নগরীর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি সাবেক মেয়র মনজুর আলম।দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মনজুর আলমকে এনসিপির চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংযোজন হিসেবে সামনে আনার পরিকল্পনা ছিল। এমনকি তাকে নগর শাখার আহ্বায়ক করা এবং ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।মূলত গত ১৪ এপ্রিল নগরীর উত্তর কাট্টলীতে মনজুর আলমের বাসভবনে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সৌজন্য সাক্ষাতের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন শুরু হয়। ওই বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে এনসিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। এরপর থেকেই ধারণা তৈরি হয়, মনজুর আলম হয়তো নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ৭ মে(বৃহস্পতিবার)-এর যোগদান অনুষ্ঠানকে ঘিরে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দীন। প্রধান অতিথি ছিলেন দলের আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।অনুষ্ঠানের আগের দিন এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় জানিয়েছিলেন, মনজুর আলমের সঙ্গে দলের ‘ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে এবং তাকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টিকে ‘চমক’ হিসেবেই রাখা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।তবে শেষ পর্যন্ত সেই চমক আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অনুষ্ঠানের আগে মনজুর আলমের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি তাকে ঘিরে বিভিন্ন মহলের অতিরিক্ত কৌতুহল, চাপ ও বিরক্তির কারণে তিনি কয়েকদিন মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন বলেও দাবি করা হয়েছে। পরিবারের এক সদস্য জানান, “ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে কোনো দলে নেওয়া যায় না। একটি পক্ষ তাকে এনসিপিতে ঠেলে দিতে চাইছিল।”৮ মে(শুক্রবার) বিকাল পর্যন্তও মনজুর আলমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, তিনি নতুন করে কোনো রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নন।এ বিষয়ে মনজুর আলম নিজেও বলেন, “আমার বয়স হয়েছে, শরীরও ভালো যাচ্ছে না। তাই নতুন করে আর কোনো রাজনীতিতে জড়াতে চাই না।”অন্যদিকে, এনসিপির নেতারা মনজুর আলমের যোগদান নিয়ে চলা আলোচনা ‘গুজব’ বলে দাবি করেছেন। এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরীর যুগ্ম-সমন্বয়কারী জসিম উদ্দিন ওপেল বলেন, “সাবেক মেয়র মনজুর আলম এনসিপিতে যোগ দেবেন কিংবা দলের হয়ে মেয়র নির্বাচন করবেন—এমন কোনো আলোচনা আমাদের সঙ্গে হয়নি।”তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় দেড় হাজার মানুষ এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া এলডিপি, আপ বাংলাদেশ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব রাখা মনজুর আলমকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অনুপস্থিতি এনসিপির জন্য কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ‘সবচেয়ে বড় চমক’ দেখানোর প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনজুরবিহীন অনুষ্ঠান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে দলটিকে।মোহাম্মদ মনজুর আলম চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) একজন সাবেক মেয়র এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ মোস্তফা-হাকিম গ্রুপ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র থাকাকালীন তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৫ সালের চসিক নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি রাজনীতি থেকে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরবর্তীতে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে (যেমন খালেদা জিয়ার কূলখানী) দেখা গেছে।২০১০ সালে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এম মনজুর আলম বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে বিএনপির সমর্থন নিয়ে তিনি আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তখন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আ জ ম নাছিরের কাছে পরাজিত হন। যদিও সেসময় রাজনীতি থেকে ইস্তফা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।জানা যায়, আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান মনজুর আলম তিন মেয়াদে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ছিলেন। তার আগে মনজুর আলম তিন দফায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর (কমিশনার) ছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালে বিভিন্ন সময় ভারপ্রাপ্ত মেয়রেরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।


মন্তব্য